প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো এলাকা থেকে চিকিৎসকদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার তথ্য আসছে। একই সঙ্গে আসছে তাঁদের মৃত্যুর খবরও। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর খবর এসেছে গত জুন মাসে, আর সবচেয়ে বেশি চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন জুলাই মাসে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা দেশে ২ হাজার ৪৯৮ জন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। আর এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৬৩ জন চিকিৎসক। এ ছাড়া করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও ৭ জন। মাত্র সাড়ে তিন মাসে (১৫ এপ্রিল থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত) এত চিকিৎসকের মৃত্যু দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলে উল্লেখ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

দেশে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত রোগী প্রথম শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত এলাকা ও রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। আর তাঁদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে বা সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হতে থাকেন চিকিৎসকেরাও।

শুরুর দিকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রীর (পিপিই) ঘাটতি, নিম্নমানের পিপিই এবং প্রশিক্ষণের অভাবই চিকিৎসকদের করোনায় সংক্রমিত হওয়ার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। কিন্তু এখন সেই সমস্যা আগের চেয়ে কমে এলেও চিকিৎসক আক্রান্তের সংখ্যা কমার পরিবর্তে বাড়ছে। গত মাসেও প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

বিএমএর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৩৯২ জন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিলেন। মে মাসে আক্রান্ত হন আরও ৩২৯ জন। কিন্তু জুন ও জুলাই দুই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ে। জুনে আক্রান্ত হন ৮৪২ জন। আর গত মাসে আক্রান্ত হন ৮৯৫ জন চিকিৎসক, যা আগের মাসগুলোর তুলনায় সর্বোচ্চ।

জুলাই মাসে এত চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিএমএর দপ্তর সম্পাদক মোহা. শেখ শহীদ উল্লাহ বলেন, সার্বিকভাবে ওই সময়ে দেশে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়াই মূল কারণ।

মৃত্যু বেশি জুনে 

দেশে করোনায় সংক্রমিত হয়ে প্রথম কোনো চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনা গত ১৫ এপ্রিলের। সেদিন মারা যান সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মঈন উদ্দীন আহমদ। এ ঘটনার পর ১৮ এপ্রিল জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদ মনোয়ার ফেসবুকে লেখেন ‘একজনের মৃত্যু একটি ট্র্যাজেডি। যখন মৃত্যুসংখ্যা লাখ ছাড়ায়, তখন তা শুধুই পরিসংখ্যান। চিকিৎসকেরা এই পরিসংখ্যানের অংশ হওয়ার চেষ্টা কোরো না। নিরাপদ থাকার চেষ্টা করো।’

সহকর্মীদের নিরাপদে থাকতে বললেও করোনার আক্রান্ত হয়ে ১২ জুন মারা যান চিকিৎসক মাহমুদও। এর আগে মে মাসে মারা যান আরও ১২ জন চিকিৎসক। এই ১২ জনের মধ্যে ৮ জন করোনায় সংক্রমিত হয়ে ও ৪ জন উপসর্গ নিয়ে মারা যান।

 সবচেয়ে বেশি চিকিৎসক মারা যান জুন মাসে, ৪৪ জন। তাঁদের মধ্যে ৩ জন করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। গত জুলাই মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১২ জন চিকিৎসক। আর চলতি আগস্ট মাসের চার দিনে মারা গেছেন একজন চিকিৎসক।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইউজিসি অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, একজন চিকিৎসক তৈরি হতে ও দক্ষ হতে অনেক সময় লাগে। এভাবে তাঁদের চলে যাওয়া স্বাস্থ্য খাত, সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষ ও দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। চিকিৎসকদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে নিরাপত্তাসামগ্রীতে কোনো ঘাটতি না রাখা এবং সচেতনতা বাড়ানোর প্রতি জোর দিয়েছেন তিনি। আরও এক চিকিৎসকের মৃত্যু 

এদিকে গত সোমবার রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কোভিড ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন চিকিৎসক নজরুল ইসলাম চৌধুরী (তসলিম)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *